প্রকাশ :: ... | ... | ...

মেক্সিকোর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ মাদক সম্রাট কে এই এল মেনচো?


সংযুক্ত ছবি

মেক্সিকোর সংগঠিত অপরাধ জগতের ইতিহাসে হাতেগোনা যে কয়টি নাম দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে, নেমিসিও অসিগুয়েরা স্যাভাতেস, যিনি ‘এল মেনচো’ নামেই বেশি পরিচিত, তাদের মধ্যে অন্যতম। মেক্সিকোর 'মোস্ট ওয়ান্টেড' এবং কুখ্যাত এই মাদক সম্রাট সেনা অভিযানে নিহত হয়েছেন। রোববার জালিস্কো অঙ্গরাজ্যের তাপালপা শহরে অভিযানে গিয়েছিল সেনাবাহিনী। রাজধানী মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার সময় তার সমর্থক ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়। সে সময় গুরুতর আহত স্যাভাতেস পরে মারা যান বলে মেক্সিকোর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় খবর দেয়। মিচোয়াকানের এক সাধারণ গ্রামীণ শিকড় থেকে উঠে এসে আধুনিক মেক্সিকোর অন্যতম বিপজ্জনক ও শক্তিশালী অপরাধী চক্র ‘জালিসকো নিউ জেনারেশন কার্টেল’-এর শীর্ষে আরোহণের গল্পটি উল্কাসম। আর এটি সম্ভব হয়েছিল তার আগ্রাসন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার কারণে। এল মেনচো হত্যাকে মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র, উভয় দেশই বড় বিজয় হিসেবে ঘোষণা করেছে। মেক্সিকো কর্তৃপক্ষ এবং যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, এই মাদক সম্রাটকে নির্মূল করতে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহৃত হয়েছে; যা দুই দেশের সরকারের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত সহযোগিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মেক্সিকোর সামরিক বাহিনীর জন্য এটি একটি বড় সাফল্য, কারণ এর ফলে অন্তত সাময়িকভাবে হলেও তার পরিচালিত অপরাধী গোষ্ঠীটি দুর্বল হয়ে পড়বে। সহিংস প্রতিক্রিয়া এল মেনচোর মৃত্যুর বদলা নিতে তার অনুসারীদের প্রতিক্রিয়া ছিল অত্যন্ত দ্রুত। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের গুয়েরেরো থেকে উত্তর-পূর্বের তামাউলিপাস, মেক্সিকোর অন্তত আটটি রাজ্যে সড়ক অবরোধ ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী মেক্সিকো সিটি এবং পার্শ্ববর্তী মেক্সিকো স্টেটও এই সংঘাত থেকে বাদ পড়েনি। সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা দেখা গেছে জালিসকো রাজ্যে। আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের ভেন্যু গুয়াদালাজারা শহরের বিপণিবিতানগুলোতে মুখোশধারী বন্দুকধারীরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। পর্যটন কেন্দ্র পুয়ের্তো ভাল্লার্থায় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপদ আশ্রয়ে আটকা পড়েছেন। রাস্তায় গাড়ি পোড়ানো এবং ব্যারিকেড সৃষ্টির এই ঘটনাগুলো নিজেদের নেতার মৃত্যুতে এক ধরনের আনুগত্য ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। তবে পরিস্থিতির উন্নতি হবে নাকি অবনতি, তা আগামী কয়েক দিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় স্পষ্ট হবে। দীর্ঘদিন ধরে যে কথাটি সত্য তা হল মেনচোর মতো প্রভাবশালী দলনেতা থাকার পরও এই ধরনের কার্টেল বা অপরাধ চক্রগুলো এতটাই শক্তিশালী যে শিগগিরই এক নতুন নেতার সামনে আসতে বেশি সময় লাগে না। কারণ, এই চক্রগুলোতে তিন থেকে চারজন নেতা হওয়ার মতো লোক থাকে। তবে তারপরও এল মেনচোর মৃত্যু মেক্সিকোর মাদকচক্রের ওপর বড় ধাক্কা। কারণ, তিনি এই চক্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে উপরে উঠে এসেছিলেন। উত্থানের ইতিহাস: ১৯৬৬ সালে মিচোয়াকান রাজ্যের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম হয়েছিল মেনচোর। তিনি ছিলেন মিচোয়াকানের আগুইলিলার বাসিন্দা। ১৯৮০-র দশকে একজন নথিবিহীন অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমানোর আগেই এল মেনচো তার নিজ রাজ্যে মারিজুয়ানা চাষের মাধ্যমে অপরাধ জগতে পা রেখেছিলেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় মাদক পাচারের দায়ে তাকে কয়েক বছর মার্কিন কারাগারেও থাকতে হয়েছে। ৩০ বছর বয়সে মেক্সিকোতে বিতাড়িত হন তিনি। দেশে ফিরে প্রথমে পুলিশে চাকরি, তারপর মাদকের জগতে প্রবেশ করেন এল মেনচো। তিনি পুরোপুরি কার্টেল কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েন এবং ‘মিলেনিও কার্টেল’-এ নিজের নিষ্ঠুরতা ও চতুরতার প্রমাণ দেন। পরবর্তীতে সেই চক্র ভেঙে যাওয়ার পর নিজের কার্টেল সিজেএনজি গড়ে তোলেন এল মানচো। এই নামটি তার নিজের নাম ‘নেমিসিও’র পরিবর্তিত রূপ। মানচোর কার্টেল মূলত ‘সিনালোয়া কার্টেল’ এবং এর নেতা জোয়াকিন ‘এল চাপো’ গুজম্যানের পতনের সুযোগ নিয়ে নিজেদের সাম্রাজ্য বিস্তার করে। এল চাপোর ছেলেদের পরাজয় এবং ইসমায়েল ‘এল মায়ো’ জাম্বাদার পতনের পর ফেন্টানিল বা মরণঘাতী মাদকের বাজারের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন এল মেনচো। যুক্তরাষ্ট্রে কোকেন, মেথামফেটামিন এবং ফেন্টানাইল পাচারের অভিযোগ ছিল মেনচোর কার্টেলের বিরুদ্ধে। তিনি শুধু মাদকপাচারে সিদ্ধহস্ত ছিলেন তাই নয়, খুন, তোলাবাজি, মানবপাচারের মতো গুরুতর অভিযোগও তার বিরুদ্ধে ছিল। তার সিজেএনজি কার্টেল মেক্সিকোর ‘সবচেয়ে শক্তিশালী এবং নির্মম অপরাধী সংগঠন’ হিসাবে বিবেচিত। মেক্সিকোর অপরাধজগতে মেনচোর প্রতিপত্তি ছিল সীমাহীন। তার প্রভাব ছিল রাজনীতিতেও। মেক্সিকোয় মাদকপাচার এবং অপরাধজগতের মুকুটহীন সম্রাট হয়ে ওঠার পর যুক্তরাষ্ট্রের নজরে আসেন মেনচো। ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকাতেও নাম ওঠে তার। ১৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র-সহ বিভিন্ন দেশের গোয়েন্দাসংস্থা দীর্ঘ দিন ধরে তাকে খুঁজছিল। এর পর মার্কিন গোয়েন্দা সূত্রে গোপন খবর পেয়ে রোববার মেনচোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে নামে মেক্সিকোর সামরিক বাহিনী। নিহত হন মেনচো-সহ সিজেএনজি কার্টেলের চার সদস্য। রাজনৈতিক সমীকরণ: মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবামের সরকার এই অভিযানকে বড় বিজয় হিসেবে তুলে ধরবে, যার প্রতিধ্বনি শোনা যাবে ওয়াশিংটনেও। অভিবাসনের পর ফেন্টানিল পাচার রোধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মেক্সিকোর কাছে যে কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেছিলেন, এটি তার একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এছাড়া এই অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের ব্যবহার ইঙ্গিত দেয় যে শেইনবাম প্রশাসন ওয়াশিংটনের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। এটি মেক্সিকোর মাটিতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একতরফা ড্রোন হামলা বা সরাসরি অভিযানের যে গুঞ্জন রিপাবলিকান মহলে শোনা যাচ্ছিল, তা আপাতত স্তিমিত করতে সহায়ক হতে পারে। তবে এল মেনচো না থাকলেও তার জায়গায় স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মত দক্ষ লোকের অভাব নেই। তাই মেক্সিকোর রাজপথে জ্বলতে থাকা আগুন সহসা নিভবে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না। বিশেষজ্ঞেরা সতর্ক করেছেন, মেনচো হত্যার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে পরিস্থিতি। সূত্র : বিডিনিউজ